করোনা-বন্ধের প্রভাব: প্রকৃতি ফিরেছে স্বমহিমায়

3 months ago
ঢাকা শহরে খোঁড়াখুঁড়ি নেই, গাছে ধুলার আস্তরণও নেই
ঢাকা শহরে খোঁড়াখুঁড়ি নেই, গাছে ধুলার আস্তরণও নেই

ফুটেছে গ্রীষ্মের ফুল কৃষ্ণচূড়া। রাজধানীর পথের ধারে, পার্কে হামেশাই চোখে পড়ছে রক্তরঙা ফুলের শোভা। তবে এবার ফুলের রক্তবর্ণটা যেন একটু বেশিই গাঢ়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে স্থবির পুরো দেশ। ঢাকা শহরে খোঁড়াখুঁড়ি নেই, গাছে ধুলার আস্তরণও নেই। গাছের পাতার রং অনেক বেশি সবুজ, বেশি সতেজ। ঢাকার রাস্তায় ধুলাবালি নেই। বায়ুদূষণের মাত্রায় সারা বিশ্বে শীর্ষে থাকা ঢাকার বাতাস অনেকটাই দূষণমুক্ত।

ঢাকার চারপাশ ঘিরে বয়ে চলা চারটি নদীর পানির রঙে এসেছে কিছুটা পরিবর্তন। চামড়া শিল্পনগরীসহ শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকায় নদীর পানির রঙে এই পরিবর্তন। দেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে শেষ ডলফিন দেখা গেছে তিন দশক আগে। করোনার কারণে পর্যটকশূন্য সৈকতে ফিরেছে ডলফিনের দল। ওরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নীল সাগরে খেলা করছে।

দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ফিরে পেয়েছে পুরনো চেহারা। নতুন সাজে সেজেছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপও। রাতের আলো, পর্যটকের অত্যাচার আর কুকুরের ভয়ে বেলাভূমিতে আসতেই পারত না মা কাছিম। কিন্তু করোনার প্রভাবে এবার পর্যটকশূন্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপে নির্ভয়ে ডিম পেড়েছে মা কাছিম। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোলায়মান হায়দার বলেন, ‘আমরা সব সময় বলেছি, সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে তার মতো করে থাকতে দিতে হবে। কিন্তু পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের দায়িত্বহীন আচরণের কারণে কাছিম হুমকিতে পড়েছে। আমরা এখনো বলছি, প্রাণীকে বিরক্ত করা যাবে না।’

ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনও ফিরে পাচ্ছে নিজেকে। পর্যটকের ভিড়ে আগে যেখানে কখনো বন্য প্রাণী দেখা যেত না, এখন সেখানে দেখা মিলছে হরিণ, শূকর, পাখিসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী। করোনা সংক্রমণের আগে ঢাকায় যানবাহনের হর্নের শব্দে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনাই যেত না। এখন সকাল থেকে রাত অবধি কানে ভেসে আসে কিচিরমিচির শব্দ। আকাশটাও তুলনামূলক বেশি গাঢ় নীল দেখা যাচ্ছে।

প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) আমীর হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা সংক্রমণের পর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবনে কিছু নতুন দৃশ্য দেখা গেছে। পর্যটকরা করমজল, কটকাসহ যেসব এলাকায় বেশি যেত, সেখানে আগে কখনো বন্য প্রাণী দেখা যেত না। এখন দেখা যাচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাস লাখো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। অর্থনীতি বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তবে করোনার কারণে মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে অন্তত একটি উপকার হয়েছে যে প্রকৃতি আপন মহিমায় ফিরে এসেছে। মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে নির্যাতন করে চলেছে। করোনা-বন্ধের ফাঁকে তাই প্রকৃতি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। প্রকৃতিকে তাঁর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে দিলে আমাদের চারপাশটা কত সুস্থ-সুন্দর থাকে, তা উপলব্ধি করার সময় এসেছে। তাই করোনা-পরবর্তী সময়ে প্রকৃতিকে নিজের মতো চলতে দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, যানজট, শিল্প-কারখানার বর্জ্য, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ, খোঁড়াখুঁড়ি, ইটভাটার ধোঁয়াসহ নানা কারণে আমরা রাজধানীর প্রকৃতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছি। করোনার কারণে প্রকৃতি যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। বাতাসের মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। গাছের পাতা এখন চকচক করছে। ঢাকা যেন সবুজায়ন হয়ে উঠেছে। মানুষও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছে।

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যানবাহনের মতো সারা দেশে নৌপথে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ। গত ২৫ এপ্রিল বুড়িগঙ্গার খোলামুড়া ঘাটে গিয়ে নদীর পানির রঙে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রাও বলছে, বুড়িগঙ্গার কালো কুচকুচে পানির রং ক্রমেই কালোমুক্ত হচ্ছে।

নদী নিয়ে কাজ করা রিভারাইন পিপল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, সদরঘাট থেকে প্রতিদিন ঢাকার বাইরে ৩০ হাজার মানুষ যাতায়াত করে। এ যাতায়াতের মাধ্যমে একজন যাত্রী আধাকেজি বর্জ্য তৈরি করে। যেটা এখন বন্ধ। ফলে লঞ্চ বন্ধ থাকায় এখন নদীতে এসব বর্জ্য পড়ছে না।

রিভারাইন পিপলের পরিচালক মোহাম্মদ এজাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, লকডাউনের কারণে ঢাকার চারপাশে শিল্প-কারখানা বন্ধ। চামড়া শিল্পনগরীও বন্ধ। ফলে নদীতে আগের মতো বর্জ্য পড়ছে না। তা ছাড়া প্রতিদিন সদরঘাট থেকে লঞ্চ চলাচল না করায় মনুষ্য বর্জ্যও নদীতে পড়ছে না। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদীর পাশে ৫৫৭টি ডাস্টবিন রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন বর্জ্য ফেলা হতো। তাও এখন পড়ছে না। প্লাস্টিক দূষণও আগের মতো হচ্ছে না। এসব কারণে ঢাকার চারপাশে নদীগুলোতে দূষণের মাত্রা কিছুটা কমেছে। ফলে নদীর পানির রঙে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।

এই প্রতিবেদনটি শেয়ার করুন
আপনার মন্তব্য দিন

পাঠকের মন্তব্য

300x250.jpg
সকল সংবাদ